মেসোপটেমীয় সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন এবং বিশ্বের প্রথম সার্থক মহাকাব্য 'গিলগামেশ'-এর অন্যতম কেন্দ্রীয় ও রহস্যময় চরিত্র হলো উতনাপিশতিম। তিনি কেবল একজন মানুষ নন, বরং তিনি বিনাশী মানবজাতি এবং অবিনাশী দেবতাদের মধ্যবর্তী এক যোগসূত্র। ইতিহাসের পাতায় এবং পুরাণের পাতায় তাঁর অবস্থান এমন এক স্থানে, যেখানে মৃত্যুভয় আর অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
সুপ্রাচীন সুমেরীয় শহর 'শুরুপ্পাক'-এর রাজা ছিলেন উতনাপিশতিম। তাঁর নামের আক্ষরিক অর্থ হলো "যিনি জীবন খুঁজে পেয়েছেন"। মেসোপটেমীয় পুরাণে তাঁকে কেবল একজন জ্ঞানী শাসক হিসেবেই নয়, বরং দেবতাদের পরম ভক্ত হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তবে তাঁর অমরত্বের কাহিনী মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ—'মহাপ্লাবন'-এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পুরাণ অনুসারে, একদা দেবরাজ এনলিল মর্ত্যের মানুষের কোলাহলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। মানুষের কোলাহলের কারণে দেবতাদের ঘুম আসত না, তাই ক্ষুব্ধ হয়ে এনলিল সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মহাপ্লাবনের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। কিন্তু জ্ঞান ও জলের দেবতা এয়া (বা এনকি) মানুষের প্রতি দয়াপরবশ ছিলেন। তিনি সরাসরি এনলিলের আদেশ অমান্য করতে পারতেন না, তাই তিনি উতনাপিশতিমের কুঁড়েঘরের দেওয়ালকে উদ্দেশ্য করে আসন্ন বিপদের কথা শুনিয়ে দিলেন।
দেবতা এয়া বললেন, "হে শুরুপ্পাকের পুত্র, তোমার ঘর ভেঙে একটি বিশাল নৌকা তৈরি করো। ধন-সম্পদ বিসর্জন দাও, কেবল তোমার প্রাণ এবং সমস্ত প্রাণিকুলের বীজ রক্ষা করো।"
উতনাপিশতিম সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তিনি একটি সাততলার বিশাল ঘনকাকৃতি নৌকা তৈরি করেন। তাতে তিনি তাঁর পরিবার, দক্ষ কারিগর, সোনা-রুপা এবং বন্য ও গৃহপালিত পশুদের আশ্রয় দেন। টানা ছয় দিন ও সাত রাত ভয়াবহ ঝড় ও বৃষ্টির পর পৃথিবী যখন শান্ত হয়, তখন দেখা যায় চারদিকে কেবল জল। উতনাপিশতিম একটি ঘুঘু এবং পরে একটি কাক ছেড়ে দিয়ে ডাঙার সন্ধান পান। তাঁর নৌকাটি 'নিসির' পর্বতের চূড়ায় আটকে যায়।
প্লাবন শেষে উতনাপিশতিম যখন জাহাজ থেকে নেমে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন, তখন দেবতা এনলিল অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন কারণ একজন মানুষ প্লাবন থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু দেবতা এয়া এবং অন্যান্য দেবতাদের হস্তক্ষেপে এনলিল শান্ত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে মানবজাতি না থাকলে দেবতাদের পুজো করার কেউ থাকবে না। অবশেষে প্রসন্ন হয়ে এনলিল উতনাপিশতিম এবং তাঁর স্ত্রীকে আশীর্বাদ করেন এবং তাঁদের অমরত্ব দান করেন। তাঁদেরকে পৃথিবীর এক দুর্গম প্রান্তে, সূর্যোদয়ের দেশে বা 'দিলমুন'-এ স্থান দেওয়া হয়, যা দেবতাদের উদ্যান হিসেবে পরিচিত।
মহাকাব্যের প্রধান নায়ক রাজা গিলগামেশ যখন তাঁর প্রিয় বন্ধু এনকিদুর মৃত্যুতে শোকাহত হন, তখন তাঁর মনে মৃত্যুর ভয় জেঁকে বসে। তিনি অমরত্বের গোপন রহস্য জানার জন্য দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে উতনাপিশতিমের কাছে পৌঁছান। এখানে উতনাপিশতিম একজন গুরুর ভূমিকা পালন করেন।
গিলগামেশকে তিনি রূঢ় সত্যটি মনে করিয়ে দেন: "জীবন ও মৃত্যু উভয়ই নির্ধারিত। মানুষ যখন মারা যায়, তখন সে এক চিরন্তন ঘুমের দেশে চলে যায়।" গিলগামেশকে তিনি অমরত্বের পরীক্ষা হিসেবে ছয় দিন ও সাত রাত জেগে থাকতে বলেন। কিন্তু ক্লান্ত গিলগামেশ প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েন। এই ঘটনাটি প্রতীকীভাবে বোঝায় যে, যে মানুষ সাধারণ ঘুমের কাছে পরাজিত হয়, তার পক্ষে মৃত্যুকে জয় করা অসম্ভব।
উতনাপিশতিমের কাহিনী কেবল একটি গল্প নয়, এটি বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত 'নোয়ার নৌকা' (Noah's Ark) এবং হিন্দু পুরাণে বর্ণিত 'মনু'-র কাহিনীর সাথে উতনাপিশতিমের কাহিনীর অবিশ্বাস্য মিল পাওয়া যায়। ১৮৭২ সালে যখন জর্জ স্মিথ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত কিউনিফর্ম ট্যাবলেট থেকে এই কাহিনী অনুবাদ করেন, তখন তা ধর্মতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, আদিম মেসোপটেমীয় সভ্যতার লোকগাঁথাই পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের প্লাবন-উপাখ্যানের উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
উতনাপিশতিম চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে জীবনের শেষ আছে এবং সেই নশ্বরতাকেই মেনে নেওয়া মানুষের সার্থকতা। তিনি অমরত্ব পেলেও শেষ পর্যন্ত গিলগামেশকে বুঝিয়েছিলেন যে মানুষের অমরত্ব তার শরীরে নয়, বরং তার কাজে এবং অর্জনে নিহিত। আজও মেসোপটেমীয় ধুলোবালি মাখা মাটির ট্যাবলেটগুলোতে উতনাপিশতিম অমর হয়ে আছেন মানুষের আদিম জিজ্ঞাসা এবং বেঁচে থাকার আকুলতার প্রতীক হিসেবে।
*Notification--
সুপ্রাচীন সুমেরীয় শহর 'শুরুপ্পাক'-এর রাজা ছিলেন উতনাপিশতিম। তাঁর নামের আক্ষরিক অর্থ হলো "যিনি জীবন খুঁজে পেয়েছেন"। মেসোপটেমীয় পুরাণে তাঁকে কেবল একজন জ্ঞানী শাসক হিসেবেই নয়, বরং দেবতাদের পরম ভক্ত হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তবে তাঁর অমরত্বের কাহিনী মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ—'মহাপ্লাবন'-এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পুরাণ অনুসারে, একদা দেবরাজ এনলিল মর্ত্যের মানুষের কোলাহলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। মানুষের কোলাহলের কারণে দেবতাদের ঘুম আসত না, তাই ক্ষুব্ধ হয়ে এনলিল সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মহাপ্লাবনের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। কিন্তু জ্ঞান ও জলের দেবতা এয়া (বা এনকি) মানুষের প্রতি দয়াপরবশ ছিলেন। তিনি সরাসরি এনলিলের আদেশ অমান্য করতে পারতেন না, তাই তিনি উতনাপিশতিমের কুঁড়েঘরের দেওয়ালকে উদ্দেশ্য করে আসন্ন বিপদের কথা শুনিয়ে দিলেন।
দেবতা এয়া বললেন, "হে শুরুপ্পাকের পুত্র, তোমার ঘর ভেঙে একটি বিশাল নৌকা তৈরি করো। ধন-সম্পদ বিসর্জন দাও, কেবল তোমার প্রাণ এবং সমস্ত প্রাণিকুলের বীজ রক্ষা করো।"
উতনাপিশতিম সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তিনি একটি সাততলার বিশাল ঘনকাকৃতি নৌকা তৈরি করেন। তাতে তিনি তাঁর পরিবার, দক্ষ কারিগর, সোনা-রুপা এবং বন্য ও গৃহপালিত পশুদের আশ্রয় দেন। টানা ছয় দিন ও সাত রাত ভয়াবহ ঝড় ও বৃষ্টির পর পৃথিবী যখন শান্ত হয়, তখন দেখা যায় চারদিকে কেবল জল। উতনাপিশতিম একটি ঘুঘু এবং পরে একটি কাক ছেড়ে দিয়ে ডাঙার সন্ধান পান। তাঁর নৌকাটি 'নিসির' পর্বতের চূড়ায় আটকে যায়।
প্লাবন শেষে উতনাপিশতিম যখন জাহাজ থেকে নেমে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন, তখন দেবতা এনলিল অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন কারণ একজন মানুষ প্লাবন থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু দেবতা এয়া এবং অন্যান্য দেবতাদের হস্তক্ষেপে এনলিল শান্ত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে মানবজাতি না থাকলে দেবতাদের পুজো করার কেউ থাকবে না। অবশেষে প্রসন্ন হয়ে এনলিল উতনাপিশতিম এবং তাঁর স্ত্রীকে আশীর্বাদ করেন এবং তাঁদের অমরত্ব দান করেন। তাঁদেরকে পৃথিবীর এক দুর্গম প্রান্তে, সূর্যোদয়ের দেশে বা 'দিলমুন'-এ স্থান দেওয়া হয়, যা দেবতাদের উদ্যান হিসেবে পরিচিত।
মহাকাব্যের প্রধান নায়ক রাজা গিলগামেশ যখন তাঁর প্রিয় বন্ধু এনকিদুর মৃত্যুতে শোকাহত হন, তখন তাঁর মনে মৃত্যুর ভয় জেঁকে বসে। তিনি অমরত্বের গোপন রহস্য জানার জন্য দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে উতনাপিশতিমের কাছে পৌঁছান। এখানে উতনাপিশতিম একজন গুরুর ভূমিকা পালন করেন।
গিলগামেশকে তিনি রূঢ় সত্যটি মনে করিয়ে দেন: "জীবন ও মৃত্যু উভয়ই নির্ধারিত। মানুষ যখন মারা যায়, তখন সে এক চিরন্তন ঘুমের দেশে চলে যায়।" গিলগামেশকে তিনি অমরত্বের পরীক্ষা হিসেবে ছয় দিন ও সাত রাত জেগে থাকতে বলেন। কিন্তু ক্লান্ত গিলগামেশ প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়েন। এই ঘটনাটি প্রতীকীভাবে বোঝায় যে, যে মানুষ সাধারণ ঘুমের কাছে পরাজিত হয়, তার পক্ষে মৃত্যুকে জয় করা অসম্ভব।
উতনাপিশতিমের কাহিনী কেবল একটি গল্প নয়, এটি বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত 'নোয়ার নৌকা' (Noah's Ark) এবং হিন্দু পুরাণে বর্ণিত 'মনু'-র কাহিনীর সাথে উতনাপিশতিমের কাহিনীর অবিশ্বাস্য মিল পাওয়া যায়। ১৮৭২ সালে যখন জর্জ স্মিথ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত কিউনিফর্ম ট্যাবলেট থেকে এই কাহিনী অনুবাদ করেন, তখন তা ধর্মতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, আদিম মেসোপটেমীয় সভ্যতার লোকগাঁথাই পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের প্লাবন-উপাখ্যানের উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
উতনাপিশতিম চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে জীবনের শেষ আছে এবং সেই নশ্বরতাকেই মেনে নেওয়া মানুষের সার্থকতা। তিনি অমরত্ব পেলেও শেষ পর্যন্ত গিলগামেশকে বুঝিয়েছিলেন যে মানুষের অমরত্ব তার শরীরে নয়, বরং তার কাজে এবং অর্জনে নিহিত। আজও মেসোপটেমীয় ধুলোবালি মাখা মাটির ট্যাবলেটগুলোতে উতনাপিশতিম অমর হয়ে আছেন মানুষের আদিম জিজ্ঞাসা এবং বেঁচে থাকার আকুলতার প্রতীক হিসেবে।
*Notification--
